শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ০৩:৩০ পূর্বাহ্ন
ভয়েস অব বরিশাল ডেস্ক॥ নদীমাতৃক বাংলাদেশ নদীকে তুলনা করা হয় মায়ের সঙ্গে। অথচ নদীর প্রতি আমাদের কোনো ভালোবাসা নেই; নদীমাতাকে রক্ষায় নেই কোনো সচেতনতা। তেরোশত নদীর এই দেশে অধিকাংশ নদীই তাই বিলীন হয়ে গেছে। চারশ বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ রাজধানী ঢাকা গড়ে ওঠেছে যে নদীর তীরে, সেই বুড়িগঙ্গার দশাও খুবই সঙ্গীন। এ যেন নদী নয়, বর্জ্যরে ভাগাড়। বছরের পর বছর ধরে বর্জ্য ফেলতে ফেলতে শ^াসরুদ্ধ পরিস্থিতি হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার।
শুক্রবার দুপুর ১২টা বেজে ১০ মিনিট। রাজধানীর শ্যামবাজারে পাইকারি কাঁচামালের আড়তের বিপরীতে বুড়িগঙ্গাপাড়ে একটি দশ-এগারো বছরের শিশুর হাতে দেখা গেল ময়লাভর্তি দুটি ঝুড়ি। পাড়ে দাঁড়িয়ে ময়লাগুলো নদীতে ফেলে দিয়ে ফিরছে সে। পিছু নিয়ে দেখা গেল, শিশুর গন্তব্যস্থল ওই এলাকারই ছোট একটি খাবার হোটেল, নাম বরিশাল হোটেল। শিশুটির কাছ থেকে জানা গেল, এভাবে প্রতিদিনই হোটেলের বর্জ্য তাকে দিয়ে নদীতে ফেলান মালিক মনির হোসেন। হোটেল মালিক শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে দোষ স্বীকার করে এরপর থেকে ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবেন জানান। এভাবে নদীর দুই পাড়ে প্রতিনিয়ত পাইকারি আড়ত, হোটেল ও গৃহস্থলির আবর্জনা ফেলা হয়।
বর্ষার শুরুতে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রাণ ফিরতে শুরু করলেও এসব বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় নদীর পানি দূষণের পাশাপাশি ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। দুর্গন্ধে টিকতে পারেন না সেখানে বাজার করতে বা হাঁটতে আসা মানুষ। তবে দূষণের দায় নিতে রাজি নয় কেউই। আড়তদারদের দাবি, লঞ্চের বর্জ্যইে বাড়ছে নদীর দূষণ।
সরেজমিনে রাজধানী শ্যামবাজার, ফরাশগঞ্জ এবং বাদামতলী এলাকা ঘুরে চোখে পড়ে সারি সারি ফল ও সবজির আড়ত। এসব আড়তের বর্জ্যরে দেখা মিলছে নদীর পাড়েই। সেসব বর্জ্য স্তূপ হয়ে বন্ধ হয়ে আছে ওয়াসার পানি নিষ্কাশনের পাইপ। নদীর পানিতে দেখা যায়, পচা টমেটো, পেঁয়াজ-রসুনের খোসা, মৃত প্রাণীর দেহ, কলাপাতা ও পচা শাকসবজি।
নদীর পাড়ে দীর্ঘদিন জমে থাকা এসব ময়লা-আবর্জনার পচা গন্ধে এ পথে হাঁটা-চলায় অসুবিধা হয় বলে অভিযোগ করেন একাধিক পথচারী। কাগজীটোলা থেকে বাজার করতে আসা ইসরাফিল আলম বলেন, ‘এখানে দাম একটু কম এবং টাটকা জিনিস পাওয়া যায়। কিন্তু ময়লার দুর্গন্ধে দাঁড়ানোই যায় না। নদীর পাশ থেকে ময়লা-আবর্জনার পচা গন্ধ বাজারে ঢুকছে। সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত।’
ছুটির দিনে নদীর পাড়ে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী মাহতাব লিমন বলেন, ‘ছুটির দিন হওয়ায় এসেছিলাম বুড়িগঙ্গার পাড়ে ঘুরতে। বর্ষার শুরুতে নদীর পানি পরিষ্কার হওয়ার কথা। কিন্তু ময়লার দুর্গন্ধে দাঁড়াতেই পারছি না। মূলত নদীপাড়ের ময়লা আবর্জনাই নদীতে মিশে এখানকার বাতাসে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করেছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদরঘাটের এক চা বিক্রেতা বলেন, আড়তের ময়লা যাদের ফেলার দায়িত্ব থাকে, তারা কষ্ট করা দূরে যেতে চায় না বলে নদীর পাড়ে ফেলে। এ ছাড়া স্থানীয় হোটেল এবং বাসাবাড়ির অনেকেই এখানে ময়লা ফেলে। এভাবে ফেলতে ফেলতে অনেক ময়লা জমে গেছে। মাঝে মাঝে এখান থেকে ময়লা পরিষ্কার করলেও পুরোটা পরিষ্কার হয় না।
তবে আড়ত মালিকদের দাবি, তারা নদীতে ময়লা ফেলেন না। শ্যামবাজার আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সেলিম দাবি করেন, আড়তের নয়, লঞ্চের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা। তিনি বলেন, ‘আমাদের আড়তের ময়লা আমরা ঘরে জমা করি এবং এখান থেকে সিটি করপোরেশনের লোক এসে ময়লা নিয়ে যায়। এখানে প্রতিটি দোকানই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য রাখবে এবং সঠিক স্থানে বর্জ্য ফেলবে এমন নির্দেশনা সবাইকে দেওয়া আছে। এখানে আমাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসা। নদী আমরা দূষণ করি না। নদী দূষণ করে লঞ্চ মালিকরা, লঞ্চের বর্জ্য।’
তবে স্থানীয় এক আড়ত মালিক বলেন, ‘আমরা নদীতে ময়লা ফেলি না। তবে রাস্তার পাশে যেসব ভাসমান দোকানি কাঁচামালের ব্যবসা করে, তারা হয়তো আবর্জনা নদীতে ফেলে থাকতে পারে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ তওহীদ সিরাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে একাধিকবার জনসংযোগ কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
Leave a Reply